কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ! | Power of Abul Khair
প্রিয় পাঠক আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে, যারা অনেক সময় বড় বড় সপ্ন দেখে। সপ্ন দেখে বড় বিজনেসম্যান হবার , নিজের পছন্দের একটা রেস্টুরেন্ট দেওয়ার। কিন্তু ব্যবসা শুরু করতে তো টাকা লাগে। বাসা থেকেও এই টাকা দিবে আর নিজেদের পকেটেও অতো টাকা নাই যে একটা ব্যবসা দাড় করাতে পারবো। আমাদের আজকের ভিডিওটা ওইসব মানুষের জন্যই। কেননা আজকের এই ভিডিওটি এমন একটা গ্রুপ অফ কোম্পানিকে যার প্রতিষ্ঠাতা তার জীবনের পথচলা শুরু করেছিলেন সামান্য একটা মুদী দোকানের কর্মচারী হিসেবে কিন্তু পরে শেষ অব্দি একটা বড় ব্যবসায়িক সম্রাজ্য তৈরী করে গিয়েছিলেন। বিজনেজ মিনিয়ার আজকের ব্লগটি হলো আবুল খায়ের গ্রুপকে নিয়ে । তাহলে চলুন ব্লগটি শুরু করা যাক।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এর নাটেশ্বর গ্রাম। সেখানেই বাস করে সেরাজুল হক। আর এই পরিবারের জন্ম নেয় আবুল খায়ের। তিন সন্তানের মধ্যে মেজো ছিলেন তিনি।
আবুল খায়েরের জন্ম হয় ব্রিটিশ আমলে ১৯২৯ সালে। গ্রামের একটা স্কুলেই পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। এরপর গ্রামের এক লোকরই হাত ধরে ক্লাস নাইন এ পড়া অবস্থায় চট্টগ্রাম এর পাহাড়তলীতে চলে আসেন।
তখন ১৯৪৬ সাল সেখানে গাফফার নামের এক লোকের মূদির দোকানে চাকরি নেয় আবুল খায়ের। মাস শেষে যা অল্প কিছু টাকা পেতেন, তার অল্প কিছু রেখে বাকিটা বাসায় পাঠিয়ে দিতেন।
অনেক দিন মুদীর দোকানে কাজ করার পর, নিজের একটা দোকান দেওয়ার শখ জাগে আবুল খায়ের এর। বাবাকে জানালে তিনি একটা জমি বিক্রি করে আবুল খায়ের এর হাতে টাকা তুলে দেন।
বাবার দেওয়া টাকা আর নিজের জমানো টাকা দিয়ে ১৯৫১ সালের দিকে পাহাড়তলী বাজারে মনিহারি পণ্যের একটা দোকান দেন আবুল খায়ের। সে সময় পাহাড়তলী হজ ক্যাম্প চালু ছিল৷ হাজীদের আনাগোনায় দুই বছরেই তার ব্যবসায় ভালো একটা লাভ হয়। কিন্তু এখানেই তো থেমে থাকার পাত্র নন আবুল খায়ের।
সে সময় দেশে জনপ্রিয় পাট, বিড়ি আর ইটের ব্যবসা। তাই ১৯৫৩ সালেই পাহাড়তলী বাজারে দুজন কর্মী নিয়ে বিড়ি বানাতে শুরু করেন আবুল খায়ের। সেই বিড়ির নাম যেন *৪২নং আবুল খায়ের”। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিড়ির ব্যবসা জমে উঠে।
আর সেই থেকেই ফেনী, নোয়াখালী আর কুমিল্লায় বিড়ির কারখানা দেন তিনি। পাশাপাশি শুরু করেন ইটেরভাটা। ১৯৬৪ সালেই সীতাকুণ্ড এর মাদামবিবির হাট এলাকায় জমি কিনে গড়ে তুলেন ইটভাটা। সেই ইটভাটা কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে গেলে৷ পাশের মুরগীর ফার্ম থেকে ৪৫ একর জমি কিনে আরেকটা ইট ভাটা দেন। সেটা যদিও ২০০৭ সাল অব্দি চালু ছিল।
শিল্পকারখানার ব্যবসার পাশাপাশি আবুল খায়ের নাম লিখান আমদানির ব্যবসাতেও। সে সময় খাতুনগঞ্জ এর অদূরে জেল রোডে প্রতিষ্ঠান খুলে পণ্য বাণিজ্যের ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে শুরু করেন ইস্পাতের পাত, সিমেন্ট, নারিকেল তেল, গুড়া দুধ আর সিগারেটের কাগজ আমদানির ব্যবসা।
১৯৬৮ সালে পাহাড়তলী বাজারে চালু করেন লুঙ্গী এর বিজনেস। নাম দেন শিশমহল। তবে ১৯৭৩ সালে সুতার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই ব্যবসা।
১৯৭৪ সালে দেশ মুক্তি লাভ করলে নোয়াখালীতে একটা সিনেমা হল ও দেন। যদিও সেটা ২০০৩ সাল অব্দি চালু ছিল।
তবে অল্প বয়সে শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বাধে আবুল খায়ের এর। তবু থেমে থাকেন নি। চট্টগ্রাম এ একটা টেক্সটাইল কারখানার জন্য আবেদন ও করেছিলেন। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কেবল আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু এর মাঝেই ১৯৭৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী মাত্র ৪৯ বছর বয়সে আট ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী রেখে না ফেরার দেশে চলে যান।
বাবা মারা যাবার পর বড় ছেলে ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। আবুল খায়ের এর স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। আবুল খায়ের এর ভাই ও এসময় পরিবারটির পাশে এসে দাড়ান।
আবুল খায়েরের উত্তরসূরিরা পরে গড়ে তুলে স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা, চা বাগান, ডেইরি প্রডাক্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গ্রুপ স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে দুগ্ধ খাতে নাম লেখায়। এরপর ১৯৯৬ সালে যোগ হয় স্টারশিপ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। ১৯৯৭ সালে আসে মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার এবং সিলন চা নিয়ে বাজারে আসে ২০০৪ সালে। দেশের সিমেন্ট খাতের বেশির ভাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম আবুল খায়েরের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্ট। ১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গরু মার্কা ঢেউটিন দিয়ে ইস্পাত শিল্পে নাম লেখায়।
ভারী শিল্পে রয়েছে আবুল খায়েরের আধিপত্য। দেশের সিমেন্ট খাতের বেশির ভাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম আবুল খায়েরের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৫০ লাখ টন। দেশে বিদেশী কয়েকটি সিমেন্ট কোম্পানি থাকলেও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করছে শাহ সিমেন্ট।
আবুল খায়ের গ্রুপ বর্তমানে বাংলাদেশের লিডিং গ্রুপ অব কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটা।
বর্তমানে আবুল খায়ের গ্রুপের অধীনে রয়েছে কনজিউমার গুডস ডিভিশন, আবুল খায়ের স্টিল, আবুল খায়ের টোব্যাকো, শাহ সিমেন্ট, আশা সিমেন্ট, এ.কে.এস., গরু মার্কা ঢেউটিন, মার্কস, আমা কফি, স্টার শিপ, স্টেলা, আস্ট্রা, শাহ সিমেন্ট আরএমসি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
এর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ১৯৯২ সালের আইন অনুযায়ী চালু হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ তারিখে উদ্বোধন ও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে ।
আমা কফি (Ama Coffee), বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র নিজস্ব কফি ব্রান্ড এটি। এবং আবুল খায়ের গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নতুন। মাত্র ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে এটি।
প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি (Presidency University) ঢাকার গুলশানে অবস্থিত একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়; এটি ২১ জুলাই ২০০৩ তারিখে সরকারি অধিকার পায় ও সেপ্টেম্বর ২০০৩-এ শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করে ।
বর্তমানে আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মী সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।
ব্লগের মাঝে একটা আউট অফ দ্যা বক্স কথা বলা যাক। প্রিয় পাঠক আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা কফি খুব পছন্দ করেন। কিন্তু দেশের কফির মার্কেটের প্রায় পুরাটাই ডমিনেন্ট করে ন্যাসক্যাফে।
আর আমাদের মধ্যেই অনেকে জানে যে ন্যাসক্যাফে একটা ইজরাইলি পন্য। আর ইজরাইল লাস্ট কয়েক দশক ধরে যে কাজগুলো করে যাচ্ছে সেগুলুতে একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সাপোর্ট করতে পারি না৷
আবুল খায়ের গ্রুপের কিন্তু একটা নিজস্ব কফি ব্রান্ড আছে “আমা কফি” ইজরাইলের পণ্য বয়কটের সময় যারা অনেকেই ন্যাসক্যাফের বিকল্প খুজে পান না। তারা কিন্তু দেশীয় এই পন্য ব্যবহার করতে পারতেন।
তবে হ্যা এটা স্পনসরের জন্য নয়। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের যেই দায়িত্ব সেখান থেকেই বলা।
প্রিয় পাঠক আমাদের বিজনেজ মিনিয়ার আজকের ব্লগটি এই পর্যন্তই। ব্লগটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো তা আমাদের জানাতে ভুলবেন না। সেই সাথে আর কোন কোন টপিকের উপর আপনি ব্লগ পড়তে চান তাও আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। কথা হবে নতুন কোন টপিক নিয়ে নতুন কোন ব্লগে সেই অব্দি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সচেতন থাকুন। ধন্যবাদ।