দেশবন্ধু কি হারিয়ে যাবে? মেঘনা, সিটি আর আকিজ এর মাঝে | Deshbandhu Empire
১৯৮৯ সাল। গোলাম মোস্তফা বেছে নেন অনিশ্চিত এক পথ, ব্যবসার জগৎ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই গোলাম রহমান। শুরুটা ছিল ছোট্ট, চাল, গম, চিনি এসব পণ্য নিয়ে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য। কিন্তু লক্ষ্য ছিল বড়। এই ছোট্ট উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় দেশবন্ধু গ্রুপ।
২০২২ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রুপটি প্রায় ২৮০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে, আর প্রায় ২৫,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এই একটি প্রতিষ্ঠান। তাই Business Maniar আজকের ব্লগটিতে থাকছে, দেশবন্ধু গ্রুপ এর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, একটি শিল্প সাম্রাজ্যে রূপ নেওয়ার গল্প।
দেশবন্ধু গ্রুপের যাত্রার প্রাথমিক শিকড় অনেক পুরোনো, ১৯৩২ সালে। ওই বছর তৎকালীন পূর্ব বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি ছোট চিনিকল, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত আটটি চিনিকলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, যার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল মাত্র ২,৫০০ টন। তবে চিনির চাহিদা সে সময় ধীরে ধীরে বাড়ছিল। শহর ও গ্রামাঞ্চলে মিষ্টি জাতীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা ছিল উর্ধ্বগামী। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিনিকলটি ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি করতে থাকে। এরপর ২০০১ সালে এটি সরকারী মালিকানা থেকে বেসরকারি মালিকানায় আসে এবং তখন থেকেই দেশবন্ধু গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
তবে Deshbandhu Group নামে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে কোম্পানিটির মূল যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। গোলাম মোস্তফা সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই গোলাম রহমান। তারা চাল, গম, চিনি ইত্যাদি খাদ্যশস্যের ট্রেডিং দিয়ে শুরু করেন তাদের উদ্যোক্তা জীবন।
৮০ ও ৯০-এর দশকে বাংলাদেশের বাজার ছিল অগোছালো, খাদ্যপণ্যের ঘাটতি ছিল, আর বড় কোম্পানির আধিপত্য তখনও তৈরি হয়নি, সরবরাহ ব্যবস্থাও ছিল দুর্বল।যার ফলে বেসরকারি খাতে ধীরে ধীরে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যে। এই শূন্যতাকেই সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিলেন তারা। তারা এই ঘাটতি চিহ্নিত করে বাজারে “Refined Sugar” নামে নিজেদের ব্র্যান্ড চালু করে, যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে “Deshbandhu Group” নামে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে কোম্পানিটির মূল যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, যখন গোলাম মোস্তফা ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই গোলাম রহমান। তারা চাল, গম, চিনি ইত্যাদি খাদ্যশস্যের ট্রেডিং দিয়ে শুরু করেন তাদের উদ্যোক্তা জীবন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, ২০০১ সালে তারা দেশবন্ধু সুগার মিল কিনে সেটিকে আবার সচল করে তোলে, এবং এরপর একে একে গড়ে তোলে রাইস মিল, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্ল্যান্ট, পলিমার, প্যাকেজিং, গার্মেন্টস, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, এমনকি বিদ্যুৎ ও রিয়েল এস্টেট খাতেও প্রবেশ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা শুধু উৎপাদন করেই থেমে থাকেনি, রপ্তানিতেও প্রবেশ করেছে, তৈরি করেছে হাজার হাজার কর্মসংস্থান, এবং একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে আরও কার্যকর এবং টেকসই একটি শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ টালমাটাল সময়ে, যখন দেশে বহু কারখানা থমকে গিয়েছিল, দেশবন্ধু উল্টো পথে হেঁটে ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সব ইউনিট সচল রাখে, ৫,০০০ নতুন চাকরি যোগ করে এবং কোনো কর্মীকে ছাঁটাই না করে বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখে; এর ফলেই ২০২১-২২ অর্থবছরে তাঁদের বার্ষিক বিক্রি ১৬ শতাংশ বেড়ে পৌঁছায় ২,৮০০ কোটি টাকায় এবং সরাসরি কর্মীসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫,০০০-এ।
আজ এই শিল্পগোষ্ঠী, যার সুগার-ফুড-বেভারেজ থেকে শুরু করে বস্ত্র, প্যাকেজিং, শক্তি ও রিয়েল-এস্টেট পর্যন্ত এক ডজনের বেশি খাত, ২০২৮ সালের মধ্যে ৪০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান আর বহুগুণে বড় টার্নওভারের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে, বিশেষত তাদের পলিমার ও টেক্সটাইল ইউনিটে ব্যবহৃত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, যার আমদানি হচ্ছে জার্মানি ও চীন থেকে। ২০২৪ সালে তারা চালু করে একটি নতুন কারখানা, যার উৎপাদন সম্পূর্ণ রপ্তানিনির্ভর এবং মাসিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১,০০০ টন। এছাড়া গাজীপুরে নতুন গার্মেন্টস ও সোয়েটার কারখানায় স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৮০০টি অটোমেটেড মেশিন, যার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৯০ লাখ সোয়েটার উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে এবং ৩,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের খাদ্য ও বেভারেজ শাখাও সম্প্রসারিত হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাজার ছাড়াও তারা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। তবে চিনিকল ব্যবসায় প্রতিযোগিতা অনেক বেশি; ২০১৮ সালের পর থেকে দেশীয় চাহিদার তুলনায় পরিশোধিত চিনির উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত মজুদের চাপ তৈরি হয়েছে, আর রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায়। তবুও প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানির মাধ্যমে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে এবং ইতিমধ্যে তাদের চিনিশোধন ক্ষমতা ১,০০০ টন থেকে বাড়িয়ে ১,৫০০ টনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। অপরদিকে, পলিমার খাতে কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটি মোকাবিলা করার চেষ্টা চলছে। সব মিলিয়ে, দেশবন্ধু গ্রুপ আজ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশে রপ্তানিনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের এক শক্তিশালী উদাহরণ।
দেশবন্ধু গ্রুপ এর মূল প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলো, PRAN-RFL Group, City Group, Meghna Group of Industries, ACI, এবং Akij Group। এছাড়া অনেকেই দেশের বাজারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পণ্য বৈচিত্র্যের কারণে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, PRAN দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক, যেখানে ACI এবং City Group-এর আছে শক্তিশালী সরবরাহ চেইন ও ব্র্যান্ড নেটওয়ার্ক। Akij এবং Meghna Group-এর প্যাকেজিং ও পলিমার সেক্টরে বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে, যা দেশবন্ধুর মতো কোম্পানিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের সুগার সাপ্লাই, বেভারেজ মার্কেট, বা এক্সপোর্ট ভিত্তিক ফুড প্রসেসিং খাতে বাজার দখলের লড়াই বেশ স্পষ্ট।
এই প্রতিযোগিতামূলক প্রেক্ষাপটে গ্রুপের অভ্যন্তরীণ নীতি ও ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদ। গ্রুপ এর নেতৃত্বে আছেন চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, যিনি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত, এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গোলাম রহমান।
গ্রুপের ডিস্টিলারিজ ইউনিট তত্ত্বাবধান করছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সারোয়ার জাহান তালুকদার, যিনি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে যুক্ত হয়েছেন এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। সুগার ইউনিটের দায়িত্বে আছেন ইঞ্জিনিয়ার শাখাওয়াত হোসাইন, যিনি একজন টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডসম্পন্ন পরিচালক। পাশাপাশি স্বাধীন পরিচালক হিসেবে বোর্ডে রয়েছেন মোহাম্মদ খুরশিদ মহব্ব। আরও অনেকেই ও এই বোর্ড সদস্যরা মূলত বিভিন্ন ইউনিট ও খাতভিত্তিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা সংস্থার প্রতিদিনের পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন।
দেশবন্ধু গ্রুপের গল্প একটি ছোট্ট উদ্যোগ থেকে শুরু করে আজকের বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার যাত্রা, যা প্রমাণ করে পরিশ্রম, পরিকল্পনা আর সময়ের সাথে খাপ খাওয়ানোই সফলতার চাবিকাঠি। মহামারি সময়েও তাদের অটল অবস্থান, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ তাদের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রতীক। তাছাড়া, দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজেদের জায়গা ধরে রাখা কষ্ট সাধ্য বিষয়।
আপনাদের কোনো ব্লগ সম্পর্কে সাজেশন থাকলে কমেন্ট বক্স এ আমাদের অবশ্যই জানাবেন। এরকম সব বিসনেস রিলেটেড কন্টেন্ট পেতে চ্যানেলে ই-মেইল subscribe করে আমদের সাথেই থাকবেন, ধন্যবাদ।